Top News

ভোটে হার, নারী সংরক্ষণ বিল পাস হল না লোকসভায়

 


সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আনা “নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম” ঘিরে বর্তমানে তৈরি হয়েছে জটিল রাজনৈতিক অচলাবস্থা। যদিও ২০২৩ সালে বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে, তার বাস্তবায়ন এখনও দূরের পথ। এর মধ্যেই ২০২৬ সালে সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করার লক্ষ্যে আনা সংশোধনী প্রস্তাব লোকসভায় প্রয়োজনীয় সমর্থন না পেয়ে খারিজ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে একদিকে আইন বলবৎ থাকলেও, অন্যদিকে তা কবে এবং কীভাবে বাস্তবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা এখনও নেই।

এই আইনের মূল লক্ষ্য হল দেশের আইনসভায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। বিল অনুযায়ী, লোকসভা এবং সমস্ত রাজ্য বিধানসভায় মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের একটি আইনের দাবি উঠছিল। পঞ্চায়েত এবং পুরসভা স্তরে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ চালু হওয়ার পর সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও, জাতীয় এবং রাজ্য স্তরে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা এতদিন সম্ভব হয়নি।

মহিলাদের সংরক্ষণ বিলের ইতিহাস প্রায় তিন দশকের। প্রথমবার ১৯৯৬ সালে এই বিল সংসদে পেশ করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে একাধিক সরকার এই বিল পাশ করানোর চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে তা সফল হয়নি। বিশেষ করে, ওবিসি এবং সংখ্যালঘু মহিলাদের জন্য পৃথক সংরক্ষণের দাবি, এবং বিভিন্ন দলের স্বার্থের সংঘাত বিলটির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকার নতুনভাবে এই বিলটি পেশ করে এবং তা সংসদে পাস করাতে সক্ষম হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয়।
তবে আইনে পরিণত হলেও, এই সংরক্ষণ অবিলম্বে কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিল অনুযায়ী, মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ চালু হবে দেশের পরবর্তী জনগণনা এবং সেই অনুযায়ী সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর। অর্থাৎ, নতুন করে লোকসভা এবং বিধানসভাগুলির আসন পুনর্বিন্যাস না হওয়া পর্যন্ত এই সংরক্ষণ কার্যকর হবে না। বর্তমানে ২০২১ সালের জনগণনা এখনও সম্পন্ন হয়নি এবং ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়াও স্থগিত রয়েছে। ফলে আইনি স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে এই সংরক্ষণ কার্যকর হতে সময় লাগবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই বিষয়টিই বিরোধী দলগুলির প্রধান আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংরক্ষণকে জনগণনা এবং ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। বিরোধীদের মতে, যদি সরকারের উদ্দেশ্য সত্যিই মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়, তাহলে অবিলম্বে এই সংরক্ষণ কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। পাশাপাশি, ওবিসি এবং সংখ্যালঘু মহিলাদের জন্য আলাদা কোটা না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। তাদের দাবি, এই বিল সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অসম্পূর্ণ।
অন্যদিকে, ডিলিমিটেশন নিয়ে আলাদা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের কিছু রাজ্য, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি। তাদের আশঙ্কা, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে তাদের আসন সংখ্যা কমে যেতে পারে, যার ফলে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আশঙ্কাও মহিলাদের সংরক্ষণ বিলকে ঘিরে বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে কেন্দ্র সরকার একটি সংশোধনী বিল আনে, যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণনা এবং ডিলিমিটেশন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই মহিলাদের সংরক্ষণ কার্যকর করার পথ তৈরি করা। কিন্তু লোকসভায় এই সংশোধনী প্রস্তাব প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পায়নি এবং শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়নি। ফলে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ দ্রুত চালু করার সম্ভাবনা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, এই বিলের বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করছে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রের ওপর। জনগণনা সম্পন্ন হওয়া, ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া এগোনো এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হওয়া এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি সবকিছু নির্ধারিত সময়ে এগোয়, তাহলে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো মহিলাদের জন্য এই সংরক্ষণ কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন