Top News

একজন অসহায় স্বামী ও একজন অসহায় পিতা



একটি শিশুর জীবনে বাবার স্পর্শ পাওয়ার আগেই সব শেষ। আর এক তরুণীর জীবনে স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন অপূর্ণ থেকেই থেমে গেল। বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়—এটি হয়ে উঠেছে মানবিক বেদনার এক নীরব দলিল।

২২ বছরের কানিজ সুবর্ণা ও তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফ—মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে শনিবার গভীর রাতে। জানাজার সারিতে কান্না ছিল, ছিল নিস্তব্ধতা। কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়েছে যাঁর অনুপস্থিতি—তিনি শিশু নাজিফের বাবা, কানিজের স্বামী জুয়েল হাসান।

জুয়েল বর্তমানে যশোর জেলা কারাগারে বন্দী। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে একাধিক মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করে আটক রাখা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, এসব মামলার বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে করা এবং তারা সেগুলোকে ‘অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মনে করেন। যদিও এসব মামলার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আলাদা করে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের জন্মের আগেই জুয়েল কারাবন্দী হন। ফলে জন্মের পর একবারের জন্যও নিজের সন্তানকে কোলে নেওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। এমনকি শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার সুযোগও মেলেনি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর পর মরদেহ কারাগারে নেওয়া হলে মানবিক বিবেচনায় জুয়েলকে কারাফটকে আনা হয়। দূর থেকেই স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহ দেখেন তিনি। সেই দৃশ্যই যেন ভেঙে দেয় উপস্থিত সবাইকে। একজন বাবা—যিনি জীবনে একবারও সন্তানের স্পর্শ পাননি—শেষ বিদায়েও রয়ে গেলেন বন্দী অবস্থায়।

পরিবারের আরও দাবি, জুয়েল এক সময় জামিন পেলেও পরে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্ত্রী ও সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলের আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণেই প্যারোল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

কানিজ সুবর্ণার ভাই মো. শুভ বলেন,
“আমার বোন অনেক কষ্টে ছিল। স্বামী জেলে, ছোট বাচ্চা—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। দুলাভাই অন্তত শেষবারের মতো ছেলেটাকে একটু ছুঁতে পারল না—এটাই সবচেয়ে কষ্টের।”

শুক্রবার কানিজের স্বামীর বাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই ঘরে পাওয়া যায় শিশুটির নিথর দেহ। কীভাবে এই মৃত্যু ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে পরিবারের মনে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এটিকে আইনি কাঠামোর বাইরেও একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখছেন। আইন তার নিজস্ব পথে চলে—কিন্তু এমন মুহূর্তে মানবিক সুযোগের পরিসর কতটা থাকা উচিত, সে প্রশ্নও উঠছে।

একটি শিশুর জীবনে বাবার কোলে ওঠা ছিল না, আর বাবার জীবনে সন্তানের মুখ দেখা—সবই থেকে গেল অসম্পূর্ণ। শেষ পর্যন্ত পাশাপাশি শুয়ে রইল মা ও সন্তান, আর দূরে কোথাও এক বাবা—শুধু স্মৃতি আর আফসোস বয়ে নিয়ে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন