পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার শীর্ষ আদালত এই সংশোধন প্রক্রিয়ার সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি মাইক্রো-অবজারভারদের ভূমিকা স্পষ্ট করে দেয়।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি এন. ভি. অঞ্জারিয়ার বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, ভোটার তালিকা যাচাই ও আপত্তি নিষ্পত্তির সময়সীমা আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারির পর অন্তত এক সপ্তাহ বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি আদালত এটাও স্পষ্ট করে যে, মাইক্রো-অবজারভাররা কোনওভাবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ভোটার তালিকায় নাম সংক্রান্ত দাবি ও আপত্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন শুধুমাত্র ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO)। মাইক্রো-অবজারভারদের ভূমিকা থাকবে শুধুমাত্র সহায়তাকারী হিসেবে।
রাজ্যের আধিকারিকদের নিয়োগে নির্দেশ
আদালত পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, ৮৫৫০ জন গ্রুপ-বি আধিকারিককে SIR কাজে নিয়োগ করতে হবে। এই আধিকারিকরা প্রয়োজনে মাইক্রো-অবজারভারদের জায়গায় দায়িত্ব নিতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন এই আধিকারিকদের যোগ্যতা যাচাই করে কাজে লাগাবে।
একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন অদক্ষ বা দায়িত্বহীন অফিসারদের বদল করতে পারবে।
হিংসা ও হুমকি নিয়ে ডি জি পির কাছে জবাবদিহি
SIR প্রক্রিয়া চলাকালীন হিংসা ও হুমকির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপিকে ব্যক্তিগত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে FIR দায়ের হয়নি। এমনকি কিছু জায়গায় ফর্ম ৭ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে আদালত জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাজ্য পুলিশের দায়িত্ব এবং এই বিষয়ে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য
শুনানিতে রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি জানান, গ্রুপ-বি আধিকারিকদের তালিকা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দমা শেষাদ্রি নাইডু বলেন, এই আধিকারিকদের অনেকেরই আধা-বিচার বিভাগীয় কাজের অভিজ্ঞতা নেই। তাই প্রশিক্ষণ জরুরি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে আইনজীবী শ্যাম দিবান ও অভিষেক মনু সিংভি অভিযোগ করেন, মাইক্রো-অবজারভারদের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, নামের সামান্য বানান ভুল বা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে ব্যাপক হারে ভোটারদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
৮৫০০ আধিকারিক নিয়োগে নির্দেশ
আদালত রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়, ৮৫০৫ জন গ্রুপ-বি আধিকারিককে দ্রুত SIR কাজে যুক্ত করতে হবে। আগামী দিনের মধ্যেই তাঁদের জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে এই আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে পারবে।
সফটওয়্যার নিয়ে উদ্বেগ
শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি সফটওয়্যারের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলায় মধ্যনাম বা নামের ভিন্ন রূপ থাকায় বহু মানুষকে অযথা নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
আদালত জানায়, প্রযুক্তির ব্যবহার যেন বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা না করে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। তৃণমূল নেতা, সনাতনী সংসদ ও মুখ্যমন্ত্রী নিজেও আদালতের দ্বারস্থ হন। অভিযোগ, প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ তালিকায় ফেলা হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আদালত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন