কলকাতা শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ‘ধাপা’ ডাম্পিং গ্রাউন্ড শুধু জঞ্জালের স্তূপ নয়, বরং এটি তিলোত্তমার পরিবেশের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ। তবে দীর্ঘ কয়েক দশকের সেই ভয়াবহ চিত্র এবার অতীত হতে চলেছে। কলকাতা পৌরনিগম (KMC) এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে—ধাপার প্রতিদিনের জঞ্জাল থেকে এবার সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই আধুনিকীকরণের নাম দেওয়া *হয়েছে‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ (Waste-to-Energy) প্রকল্প।*
বর্তমানে ধাপায় প্রতিদিন গড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। এর ফলে পাহাড়ের মতো জমে থাকা আবর্জনা থেকে ক্ষতিকর মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, যা বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং প্রায়ই ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। পুরসভার নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ জঞ্জালের মধ্যে থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০০০ টন বর্জ্য আলাদা করে তা বৈজ্ঞানিক ইনসিনারেশন (Incineration) পদ্ধতিতে পোড়ানো হবে। এই দহন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপশক্তিকে ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হবে, যা থেকে বড় অংকের বিদ্যুৎ শক্তি গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট সংস্থা নিয়োগের তৎপরতা:-
এই প্রকল্পটি অত্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল। তাই কোনো ভুল পদক্ষেপ এড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে কলকাতা পুরসভা দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট সংস্থা নিয়োগ করতে চলেছে।
সংস্থার ভূমিকা: এই কনসালট্যান্ট সংস্থাটির মূল কাজ হবে প্রকল্পের পুরো ডিজাইন তৈরি করা, কোন প্রযুক্তিতে সবচেয়ে কম দূষণ হবে তা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত ঠিকাদার সংস্থা খুঁজে বের করা।
নজরদারি: পোড়ানোর ফলে নির্গত হওয়া ধোঁয়া যাতে কোনোভাবেই বিষাক্ত না হয়, তার জন্য বসানো হবে উচ্চমানের ‘এয়ার পল্যুশন কন্ট্রোল সিস্টেম’, যা এই বিশেষজ্ঞ সংস্থার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
কেন এই প্রকল্প কলকাতার জন্য জরুরি?
১. জঞ্জালের পাহাড় কমানো: ধাপার জঞ্জাল ফেলার জায়গা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। নতুন করে আবর্জনা ফেলার জায়গা না থাকায় এই 'বায়ো-মাইনিং' এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনই একমাত্র বিকল্প।
২. দূষণ নিয়ন্ত্রণ: খোলা আকাশের নিচে পচতে থাকা বর্জ্য থেকে জল দূষণ (Leachate) এবং বায়ু দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিদ্যুৎ প্রকল্পে বর্জ্য ব্যবহার করলে এই ঝুঁকি শূন্যে নেমে আসবে।
৩. আর্থিক লাভ: উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করে বা পুরসভার নিজস্ব স্ট্রিট লাইট ও পাম্পিং স্টেশনগুলোতে ব্যবহার করে বছরে কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
মেয়রের বার্তা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য:-
কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, এই প্রকল্প কেবল জঞ্জাল পরিষ্কারের উপায় নয়, এটি কলকাতাকে একটি ‘স্মার্ট ও ক্লিন’ সিটি হিসেবে গড়ে তোলার পথে একটি বড় মাইলফলক। পরিবেশবিদরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, অনেক আগে এটি শুরু করা উচিত ছিল, তবে দেরিতে হলেও এই বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ কলকাতার ফুসফুসকে সতেজ করবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন