ট্যাঙ্কের গোলার শব্দে কি চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের হাহাকার? গাজা থেকে লেবানন, কিংবা ইরান—একসাথে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ লড়তে গিয়ে ইসরায়েলের পকেট এখন গড়ের মাঠ। বাইরে থেকে দেশটিকে অপরাজেয় মনে হলেও, ভেতরের অর্থনীতি কিন্তু তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।
যুদ্ধের খরচ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বাজেটই তার প্রমাণ। গত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশটি ২৭০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ভাঙার মতো বাজেট ঘোষণা করেছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই বাজেটের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ১৭ শতাংশই রাখা হয়েছে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা খাতের জন্য। ইরানের সাথে এক দফা যুদ্ধের খরচই দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১.৫২ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেভাবে জিডিপি (GDP)-র ৮.৬% শতাংশ যুদ্ধের পেছনে খরচ হচ্ছে, তাতে ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.২% থেকে নেমে ৪%-এর নিচে চলে আসবে। বিরোধীরা একে বলছেন "ইতিহাসের সবথেকে বড় চুরি", কারণ সাধারণ মানুষের উন্নয়নের টাকা এখন যাচ্ছে যুদ্ধের খাতে বারুদের পেছনে।
আমজনতার পকেটে টান, মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস
যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ ইসরায়েলিদের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। আমজনতার নাভিশ্বাস উঠার মতো পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়।
- ভাড়ায় চড়া দাম: বাসের টিকিট থেকে শুরু করে পেট্রোল—সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে। গণপরিবহনের খরচ যুদ্ধের আগের চেয়ে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংকট: বড় বড় স্কুলগুলোতে শিক্ষক নেই, পড়াশোনার সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি হাসপাতালের পরিষেবাও এখন তলানিতে। পরিসংখ্যান বলছে, ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর এই প্রথম গড় আয়ু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
- ঋণের পাহাড়: দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মধ্যবিত্ত পরিবার আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে। পকেট খালি হওয়ায় এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে হাজার হাজার তরুণ এখন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার (Migration) পথ বেছে নিচ্ছেন।
এক সময় যে ইসরায়েলকে বিশ্বের প্রযুক্তির হাব বা ‘স্টার্টআপ নেশন’ বলা হতো, সেই পরিচয় এখন সংকটে। বিশ্বজুড়ে বয়কট (BDS) আন্দোলনের কারণে বড় বড় বিদেশি টেক কোম্পানিগুলো ইসরায়েল থেকে তাদের পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছে। ‘Wiz’ বা ‘Cyberark’-এর মতো নামী কোম্পানিগুলো এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতে (ICC) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেশটির বিশ্বস্ততাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।
মিত্রহীন ভবিষ্যৎ ও ঋণের বোঝা
ইসরায়েলের ঋণের পরিমাণ জিডিপি-র ৬০% থেকে বেড়ে ৬৮% হয়েছে। একসময় যাদের হাতে বিশাল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ছিল, আজ তারা ধারের ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। আমেরিকার পাঠানো সামরিক সাহায্য দিয়ে হয়তো গোলা কেনা যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাতের অভাব মেটানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মহলে মিত্র সংখ্যাও দিন দিন কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যের জন্য অশনি সংকেত
শেষ কথা, যুদ্ধের ময়দানে হয়তো ইসরায়েল বীরত্ব দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির ময়দানে তারা দিনের পর দিন হেরে যাচ্ছে। বন্দুকের নল দিয়ে কি ক্ষুধার জ্বালা মেটানো সম্ভব? যদি দ্রুত কোনো স্থায়ী সমাধান না আসে, তবে এই যুদ্ধ জয়ের আনন্দ হয়তো দেউলিয়া হওয়ার বিষাদে পরিণত হবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন