Top News

হজযাত্রীদের উপর অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকার বোঝা, বিতর্কে কেন্দ্র

 


হজযাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানোকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনস্থ হজ কমিটি অফ ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরে হজ-এ অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক পুণ্যার্থীকে অতিরিক্ত ১০,০০০ টাকা দিতে হবে। আগামী ১৫ মে-র মধ্যে এই অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাত্রার একেবারে প্রাক্কালে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার ফলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের জ্বালানির (এটিএফ) দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক উড়ানের মোট খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জ্বালানির পেছনে খরচ হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে তা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বাড়তি চাপের জেরেই আন্তর্জাতিক উড়ানে প্রায় ৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলির ফেডারেশন। 

এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে যাত্রীদের উপর। আগে মুম্বই থেকে সৌদি আরবের হজযাত্রার বিমানভাড়া ছিল প্রায় ৯০,৮৪৪ টাকা। অতিরিক্ত ১০,০০০ টাকা যোগ হওয়ায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,০০,৮৪৪ টাকা। শুধু মুম্বই নয়, দিল্লি, কলকাতা বা দেশের অন্য যে কোনও শহর থেকেই যাত্রা করা হোক না কেন, প্রত্যেক পুণ্যার্থীকে এই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে বলেই জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই যাত্রীরা সম্পূর্ণ ভাড়া জমা দেওয়ার পর হঠাৎ করে এই অতিরিক্ত টাকা চাওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে।

এমনকি হজ কমিটি অফ ইন্ডিয়ার তরফ থেকেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একটি বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানতে চেয়েছে, যখন যাত্রীরা আগেই সম্পূর্ণ ভাড়া পরিশোধ করেছেন, তখন শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত অর্থ চাপানোর যৌক্তিকতা কোথায়।

রাজনৈতিক মহলেও এই ইস্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। আসাদউদ্দিন ওয়েইসি অভিযোগ করেছেন, হজ কমিটির মাধ্যমে যাওয়া যাত্রীদের যেন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, অধিকাংশ হজযাত্রীই সাধারণ মানুষ, যারা বহু বছর ধরে সঞ্চয় করে এই পবিত্র যাত্রার পরিকল্পনা করেন। শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তাঁদের জন্য বড় ধাক্কা। একইভাবে কংগ্রেস সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ি-ও প্রশ্ন তুলেছেন, সব কিছু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকলে শেষ মুহূর্তে কেন এই ভাড়া বৃদ্ধি করা হল।

বিতর্ক বাড়তে থাকায় ফের মুখ খোলেন কিরেন রিজিজু। তিনি জানান, ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস প্রথমে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার অতিরিক্ত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে তা কমিয়ে প্রায় ১০০ ডলারে আনা সম্ভব হয়েছে। তাঁর দাবি, এয়ারলাইনস সংস্থাগুলিকে দোষারোপ করা ঠিক নয়, তারা পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিরোধীদের ‘শোষণ’ অভিযোগ খারিজ করে তিনি বলেন, কেন্দ্র বরং যাত্রীদের উপর আরও বেশি আর্থিক চাপ পড়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে হজ ভর্তুকি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময় কেন্দ্রের যুক্তি ছিল, এই অর্থ সংখ্যালঘুদের শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবার নতুন করে খরচ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সামনে আসায় সেই পুরনো নীতিকেও ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ আবার এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করছেন। তাঁদের মতে, একদা মুঘল সম্রাটরা অ-মুসলিম তথা হিন্দুদের তীর্থযাত্রার ওপর বাড়তি কর হিসেবে ‘জিজিয়া’ প্রথা চালু করেছিলেন। এবার মোদী সরকারের এই বাড়তি টাকার খাঁড়াকে মুসলিমদের ওপর আধুনিক ‘জিজিয়া’ করের পুনরাবৃত্তি হিসেবেই দেখছেন অনেকে। সব মিলিয়ে, হজের খরচ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র-বিরোধীদের সংঘাত এখন চরমে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন