Top News

গঙ্গার পুনর্জন্ম! ১১০ থেকে বেড়ে ২৩০ প্রজাতির মাছ: 'নমামি গঙ্গে'র সাফল্যে রুপোলি বিপ্লব

বাঙালির হেঁশেলের মৎস্য-বিলাস কি তবে আবারো তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে চলেছে? তবেকি বাঙালির পাতে এবার সস্তায় ফিরবে দেশি মাছ? গঙ্গা বয়ে নিয়ে এল তেমনই এক দুর্দান্ত সুখবর। গঙ্গার জল এখন আর শুধু পবিত্র নয়, আক্ষরিক অর্থেই প্রাণচঞ্চল। 

ছবি: Flickr

এক সময় শিল্পবর্জ্য আর অযত্নে গঙ্গার বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, গঙ্গা আবার তার পুরনো রূপ ফিরে পাচ্ছে। ১৯৯৮ সালে যে গঙ্গায় মাছের প্রজাতি কমে মাত্র ১১০টিতে ঠেকেছিল, ২০২৫-এর সমীক্ষায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩০-এ।

আড়াই দশকের খরা কাটিয়ে বড় সাফল্য

সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ় রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CIFRI)-এর বিজ্ঞানীরা একে একটি 'মাইলফলক' হিসেবে দেখছেন। ১৮২২ সালের নথিতে গঙ্গায় ২৭১টি প্রজাতির মাছের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে অনিয়ন্ত্রিত দূষণ ও নিকাশি নালার বিষাক্ত জলে সেই সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছিল। তবে বিগত এক দশকে ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের অধীনে ধারাবাহিক সংরক্ষণ ও ‘স্টক এনহ্যান্সমেন্ট’ বা নদীতে মাছের পোনা ছাড়ার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের বিজনৌর থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মোহনা পর্যন্ত আড়াই হাজার কিলোমিটার পথে চলেছে নিবিড় তদারকি।

ছবি: ইন্টারনেট 

ফরাক্কার উজানেও ইলিশ!

এই সাফল্যের সবথেকে বড় বিজ্ঞাপন হলো ইলিশ। এক সময় ফরাক্কার ওপারে ইলিশ পাওয়া কার্যত অলীক কল্পনা ছিল। কিন্তু নদীর গভীরতা বৃদ্ধি ও জলজ পরিবেশের উন্নতির ফলে এখন ফরাক্কার উজানেও রুপোলি শস্যের দেখা মিলছে। সমীক্ষা অনুযায়ী:

ফরাক্কায় পাওয়া গেছে ৮৫টি প্রজাতি। বহরমপুরে ৭৬টি এবং ফ্রেজ়ারগঞ্জে ৭০টি দেশি প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব মিলেছে।

বিশেষ করে রুই, কাতলা ও মৃগেলের মতো ভারতীয় কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ও ‘রাঞ্চিং’ (নদীতে পোনা ছাড়া) পদ্ধতি গঙ্গার এই বৈচিত্র্যকে নতুন জীবন দিয়েছে।

উজ্জ্বল ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চ্যালেঞ্জ

তবে এই খুশির খবরের সাথে কিছু সাবধানবাণীও শুনিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সিআইএফআরআই (CIFRI)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৩০টি প্রজাতির মধ্যে ২২১টি দেশি হলেও ৯টি বিদেশি প্রজাতির মাছ নজরে এসেছে। এই বিদেশি মাছগুলি আমাদের দেশি মাছের বাস্তুতন্ত্রের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক তড়িৎ রায়চৌধুরীর মতে, "প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু গঙ্গার দূষণ যদি গোড়া থেকে নির্মূল করা না যায়, তবে এই সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হবে না।" এছাড়া চিন্তার আরও একটি কারণ হলো, প্রজাতির সংখ্যা বাড়লেও মৎস্যজীবীদের জালে মাছ ওঠার পরিমাণ (Fish Landing) কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না। অর্থাৎ, বৈচিত্র্য বাড়লেও সংখ্যায় তারা এখনও পর্যাপ্ত নয়।

আগামী দিনের পরিকল্পনা

বাঙালির প্রিয় মৌরলা, পুঁটি বা খলসের মতো ছোট মাছগুলোকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে নদী তীরবর্তী বলাগড়, ত্রিবেণী ও বহরমপুরের মতো এলাকায় মাঝারি মাত্রার মাছ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গার এই হারানো সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোরভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ। গঙ্গার এই পুনর্জন্ম কেবল প্রকৃতির জয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মৎস্যজীবীর জীবিকা ও বাঙালির মৎস্য সংস্কৃতি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন