ক্ষমতার মোহে আর কতকাল? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন ব্যক্তি ঠিক কতদিন সরকারপ্রধান হিসেবে থাকতে পারবেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— 'একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না'। অর্থাৎ, ১০ বছরের বেশি কুর্সিতে বসা বারণ!
কেন এই পরিবর্তনের দাবি?
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'একনায়কতন্ত্র' এবং 'ক্ষমতার অপব্যবহার' নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংবিধানের সংস্কার নিয়ে কাজ করছে। মূলত 'পাওয়ার ব্যালেন্স' বা ক্ষমতার ভারসাম্য আনাই এর মূল লক্ষ্য।
মূল প্রস্তাবনা :-
দুই মেয়াদের সীমাবদ্ধতা: কোনো ব্যক্তি তার জীবনে দুইবারের বেশি (সর্বোচ্চ ১০ বছর) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
স্বৈরতন্ত্র রোধ: দীর্ঘমেয়াদী শাসনের ফলে যে 'ব্যক্তিপূজা' তৈরি হয়, তা চিরতরে বন্ধ করা।
নতুন নেতৃত্বের সুযোগ: তরুণ এবং যোগ্য নেতৃত্বের জন্য রাজনীতির পথ প্রশস্ত করা।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রধানমন্ত্রীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত না রেখে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্র
বিশ্বের অনেক উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নিয়ম দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত।
যুক্তরাষ্ট্র: এখানে একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের (৮ বছর) বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন না।
ভারত: যদিও সেখানে মেয়াদের সরাসরি আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, তবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে ক্ষমতার পালাবদল নিয়মিত ঘটে।
ইউরোপীয় দেশসমূহ: অধিকাংশ উন্নত দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রে নেতৃত্বের পরিবর্তনের একটি সুস্থ ধারা বজায় থাকে।
জনসাধারণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনটি পাস হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় আসবে। তারা বলছেন, "যখন একজন নেতা জানবেন যে তিনি চিরকাল ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না, তখন তিনি জনগণের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ থাকবেন এবং বিদায়ের আগে একটি ভালো লিগ্যাসি (Legacy) রেখে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।"
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, যদি কোনো নেতা অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দক্ষ হন, তবে তাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তবে অধিকাংশেরই মত— ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড়, আর রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্যই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।
উপসংহার
"আজীবন প্রধানমন্ত্রী" থাকার সংস্কৃতি একটি দেশের গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। ১০ বছরের এই সময়সীমা কার্যকর হলে বাংলাদেশ একটি জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
এখন দেখার বিষয়, এই সংস্কার প্রস্তাব কত দ্রুত আইনি রূপ পায়।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন