ফের সাইবার জালিয়াতদের নিশানায় সাধারণ মানুষ, আর সেই চক্রের হদিস মিলল খোদ নৈহাটিতে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নৈহাটি পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের কারিগরপাড়া এলাকায় হানা দিয়ে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে নৈহাটি থানা। ভাড়া বাড়িতে বসে প্রতারণা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্তদের কাছ থেকে ল্যাপটপ ও একাধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনার পর এলাকায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
১. অভিযানের নেপথ্যে: পুলিশের মরণকামড়
পুলিশ সূত্রে খবর, গত কয়েক মাস ধরেই ব্যারাকপুর কমিশনারেট এলাকায় একের পর এক সাইবার চুরির অভিযোগ জমা পড়ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছিল, প্রতারণার উৎস বা অরিজিন এই শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকা। এরপরই নৈহাটি থানার পুলিশ নিজস্ব সোর্স নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে নজরদারি শুরু করে। গত রাতে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নৈহাটির একটি জনবহুল এলাকার একটি ফ্ল্যাটে হানা দেয় পুলিশের বিশেষ টিম। পুলিশ পৌঁছাতেই সেখানে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, তবে পালানোর কোনো সুযোগ দেয়নি পুলিশ।
২. উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকা (The Recovery)
তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ওই ডেরা থেকে যা উদ্ধার করেছে, তাতে চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে:
অত্যাধুনিক ল্যাপটপ: ৩-৪টি (যেখানে দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার মানুষের তথ্য মজুত ছিল)।
স্মার্টফোন: অন্তত ১৫টি (বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামী ফোন, যা কল করার জন্য ব্যবহৃত হতো)।
প্রচুর সিম কার্ড: প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রি-অ্যাক্টিভেটেড সিম কার্ড, যা ভুয়ো পরিচয়পত্র দিয়ে তোলা হয়েছিল।
ব্যাঙ্ক নথিপত্র: বেশ কিছু ডায়েরি ও খাতা উদ্ধার হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি (OTP) সংগ্রহের কৌশল লেখা ছিল।
৩. মোডাস অপারেন্ডি: কীভাবে চলত এই ঠকবাজি?
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতরা স্বীকার করেছে যে, তারা মূলত তিনটি উপায়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলত:
KYC আপডেট ও বিদ্যুৎ বিল: মানুষকে ফোন করে বলা হতো তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে যদি না তারা তড়িঘড়ি ফোনে বলা অ্যাপ ডাউনলোড করে।
পার্ট-টাইম চাকরির টোপ: হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে মেসেজ পাঠিয়ে লাইক বা শেয়ার করার মাধ্যমে ঘরে বসে হাজার হাজার টাকা রোজগারের লোভ দেখানো হতো।
সস্তায় লোন বা বিমা: কোনো রকম গ্যারান্টার ছাড়াই সস্তায় লোনের অফার দিয়ে প্রসেসিং ফি-র নামে টাকা হাতানো হতো।
৪. আন্তঃরাজ্য যোগসূত্র ও তদন্তের গতিপথ
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই চক্রের জাল শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বরং ঝাড়খণ্ড (জামতাড়া গ্যাং), বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের সাইবার অপরাধীদের সাথেও যুক্ত। ধৃত তিনজনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে পুলিশ জানতে চাইছে এই চক্রের 'মাস্টারমাইন্ড' বা মূল পাণ্ডা কে। এই ফ্ল্যাটটি তারা কতদিন আগে ভাড়া নিয়েছিল এবং স্থানীয় কেউ তাদের আশ্রয় দিয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
৫. সাইবার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
এই খবরটি প্রকাশের সাথে সাথে পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে:
ফোনে আসা কোনো সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করবেন না।
অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি চাইলে তা এড়িয়ে চলুন।
প্রতারিত হলে সঙ্গে সঙ্গে ১৯৩০ নম্বরে কল করে বা নিকটবর্তী থানায় অভিযোগ জানান।
আজ ধৃতদের ব্যারাকপুর মহকুমা আদালতে তোলা হবে এবং পুলিশ তাদের সর্বোচ্চ মেয়াদে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে। এই চক্রের সাথে আরও বড় কোনো রাঘববোয়াল জড়িত কি না, সেটাই এখন দেখার।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন