Top News

উল্টো ঘুরছে জীবনের চাকা : যাপনের নতুন ধারা 'ধীরে চলো'!

 


রোজকার সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘড়ি ধরে দৌড়ানো ,কর্মক্ষেত্রে পদউন্নতির জন্য রাতের পর রাত জাগা, দু-দন্ড শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই এই সব নানান ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই সাফল্য পাওয়া যায়। তবে সেসব এখন সেকেলে ! তা বলে দৌড়ানো টা সেকেলে না মানুষ নিজের জন্য সুস্বাস্থ্য ও আনন্দের জন্য আজীবন দৌড়ে চলেছে , নিজের জন্য এই দৌঁড়েতে সময়ে বাঁধা বিদেশি কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে দেশের মফস্বলে এসে জমি কিনে থাকছেন অনেকে,চাষবাস করছেন ভালো আয়ের চাকরির খোঁজে ছুটছেন না, অল্প আয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছেন। অনেকে তো ইন্টারনেটর জগৎ থেকে দূরে থাকতে স্মার্টফোনও কিনছেন না। এক নিঃশ্বাসে সময়ের সাথে দৌড়ানোর বিরূদ্ধে শুরু হয়েছে নতুন নীতি "ধীরে চল"।

বিদেশে অবশ্য এটি "স্লো লিভিং" পদ্ধতি হিসেবে প্রচলিত , যা নিয়ে হাসাহাসি করা বিদেশিরা হাসাহাসি করত বাঙালির সেই পু্রানো সরল ধীরস্থির জীবনযাত্রা যেখানে পেট পুরে খেয়ে ভাত ঘুম দেওয়া হয় এর সংস্কৃতিকেই অনুসরণ করছেন।

কী এই ' স্লো লিভিং '?

পশ্চিম দুনিয়ায় রোজকার দ্রুত সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে বার্গার-র‌্যাপ-রোলের মতো ‘ফাস্ট ফুড’ খাওয়ার বিশেষ করে বাচ্চাদের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, তাই এই ধরনের খাবার খাওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ও বাড়িতে রান্না করা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভাল এই নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য ইটালিতে ১৯৮৬ সালে 'স্লো ফুড মুভমেন্ট’ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে জীবনযাপনের অন্যান্য দিক গুলির ও গতি কমানোর কথা ভাবা হয়।যেমন -কাজের গতি, সম্পর্ক, ঘোরাফেরা, এবং প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা।‌‘স্লো লিভিং' নিজেকে সময় দেওয়ার কথা বলে, যাতে শরীর ও মন ভাল থাকে, আনন্দে বাঁচা যায়। গতি বাড়ার সঙ্গে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের যোগসূত্র আছে তাই একটু ধীর-স্থির ভাবে চললে তা কমে বলেও বিশ্বাস করেন অনেকে। পশ্চিম দুনিয়ায় বেশ কয়েক বছর হল ‘স্লো লিভিং’ বেশ চর্চায় রয়েছে। এখন বহু বাঙালিও এ ভাবে ভাবছেন এবং চলছেন যারা কর্পোরেট চাকরি, বেশি রোজগার ও কম বয়সে অনেক খ্যাতির জন্য দৌড়াচ্ছিলেন তাদের মধ্যে পুরানো কালচারে ফিরে যাওয়ার প্রবনতা তৈরি হয়েছে, কিছু কিছু মানুষ এই নীতিই ফলো করে চলছিলেন ,তবে এখন সংখ্যার পরিমাণটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

যেমন ঘরের কাছেই অনেকে আছেন, বীরভূমের এক গ্রামে থাকতে শুরু করেছেন অপরাজিতা সেনগুপ্ত ও দেবল মজুমদার নামে এক দম্পতি তাদের ১৫ বছরের কণ্যার কে নিয়ে বীরভূমের এক গ্রামে থাকতে শুরু করেছেন, আগে তারা থাকতেন আমেরিকাতে।‌ অপরাজিতার মতে প্রযুক্তি, সুযোগ-সুবিধা আর ব্যস্ততার মাঝেই বড় হচ্ছিল তাদের ছোট্ট মেয়ে তবে লক্ষ্য করেছিলেন মৌলিক জিনিস জল, খাদ্য, বায়ু, এ সবের মধ্যে দিয়েই বিষ ঢুকছে শরীরে।জিনিসগুলির প্রতি উদাসীনতা তৈরি হয়ে যাচ্ছিল চাকরির জন্য দু’জনেই ছুটে বেড়াচ্ছিলেন কিন্তু সন্তানের জন্য সময় বার করতে পারছিলেন না। তাই বছর দশেক হল দেশে ফিরেছেন তারা বীরভূমে দুই একর জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন থাকার জন্য মাটির বাড়ি বানান দুজনে। বাঙালির পুরনো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে ফিরে যান। নিজেদের জমি থেকেই ফল-সব্জি, চাল উৎপাদন করে সেগুলি থেকেই আয় করেন, দম্পতির মতে আগের মতো প্রচুর আয় না হলেও তাদের হাতে এখন নিজেদের জন্য সময় থাকে সন্তানের সঙ্গে অঢেল সময় কাটান, প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করেন, গোটা বই এক নিমেষে শেষ করে পারেন নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ পয়েছেন অবসর পেয়েছেন। তাদের কথায়, আমরা বেড়াতে গেলেও অনেক দিন সময় নিয়ে ঘুরি। ফেরার তাড়া থাকে না খুব। সময় নিয়ে ট্রেনে চেপেই যাই। মেয়েকে প্রকৃতির মাঝে বড় করতে পেরেছি। গ্রামের শিশুদের সঙ্গে মাঠে খেলে। তবে চাইব বড়ো হয়ে কর্পোরেট দুনিয়ার অন্ধকারে যেন ঢুকে না যায়।

এছাড়া শহরের পরিবেশে থেকে এই ধরণের স্লো লিভিং জীবন যাপন করেন অনেক মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম উদাহরণ পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। সম্প্রতি মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর ছবি ‘নধরের ভেলা।তিনি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলেন না, ধীর গতির জীবন যাপন করেন, তার কথায়,‘যে সমাজে মানুষ মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুর আশায় দৌড়ে যায়, সেখানে আমি তো সারাজীবন অবসরেই কাটিয়ে দিলাম। মাঝে মাঝে কাজ করি, ছবি বানাই। আর তাই বোধহয়, এত আনন্দ। আমার কোনও গন্তব্য নেই কোনো তাড়াও নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিচ্ছুটি না করে বসে থাকতে পারি। বাসস্ট্যান্ড বা রেলস্টেশনে অনেক ক্ষণ বসে থেকে অপেক্ষা করতে ভাল লাগে।যখন গাড়ি আসবে, তখন উঠব এতেই বড় আনন্দ আছে।

এছাড়া বছর চল্লিশের চিত্রশিল্পী এবং ‘জলাদর্শ কালেক্টিভ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা কৌস্তভ চক্রবর্তী, বছর ছাব্বিশের সঙ্গীতশিল্পী তৈষী নন্দীরা প্রকৃতির মধ্যে থেকে ধীর স্থিরভাবে জীবনযাপন করছেন। এনাদের মতোই অনেক মানুষ আছে যারা যাঁরা সময়ের অভাব নিয়ে বাঁচতে পছন্দ করেন না। তাই নিজেরাই নিজের মতো করে কাজ খুঁজছেন , করছেন কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তবে সময়কে ধন-সম্পদ টাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়। সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক প্রশান্ত রায় বলেছেন,

‘সমাজের এই দ্রুত গতি যে স্বাস্থ্য ও মনের পক্ষে ভাল নয়, তা চিকিৎসকেরা বারবার বলছেন। কিন্তু এই ধরনের জীবনযাপন সকলের ক্ষেত্রে মেনে চলা সম্ভব নয় । অধিকাংশের পক্ষেই আর্থিক ও সামাজিক কারণে জীবনের গতি কমানো সহজ হবে না। কিন্তু যাঁরা পারছেন, স্বাস্থ্যগত দিক থেকে তাঁদের জীবনের মান অবশ্যই উন্নত হয়েছে।’’


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন