বাংলার সংস্কৃতির মাধুর্য অপরিসীম। যেমন ধর্মের মেল বন্ধন তেমনই শীল্পের চারণ ভূমিও এই বঙ্গদেশ। নাচে,গানে,পটচিত্রে, টেরাকোটার কাজে, না না কাজেই মিশে আছে আন্তরিকতার স্বাদ। তবে বাংলার বহু লোক শীল্পই বিলুপ্ত প্রায়। আজ কথা বলব তেমনই এক শীল্প নিয়ে।
বাঙালীর এক অতি পরিচিত লোক শীল্প হল যাত্রা। ৫০০ বছরের বেশী এই শীল্পের ইতিহাসকে বহন করে চলেছে যাত্রা শিল্পীরা। আজ নানা অর্থনৈতিক কারণ এবং যুগ বদলের কারণেও পাল্টে যাচ্ছে এই শীল্পের ছবি খানা।'যাত্রা' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ 'যাত্রা' থেকেই। জানা যায় যাত্রার জন্ম হয় ষোড়শ শতকে শ্রী চৈতন্য দেবের হাত ধরে। তিনি তাঁর বিখ্যাত যাত্রা 'রুক্মিনী হরণ' কাহিনীতে রুক্মিনী চরিত্রে অভিনয় করতেন। নাচ,গান এবং রঙিন সাজের মাধ্যমে নানা পৌরাণিক ও আঞ্চলিক কাহিনী শোনাতেন যাত্রা শিল্পী। এনাদের জীবন যাপন ছিল কতক যাযাবরের মতই। বেশি দিন এক জায়গায় থেকে এনারা অনুষ্ঠান করতেন না। নানা স্থানে স্থানে ঘুরে ঘুরে হত এনাদের কাজ। মাঠের মাঝে তৈরি হত মাচা। সেই মাচার চার দিকে থাকত দর্শক আর মধ্য ভাগে থাকতেন কলাকুশলীরা। মহাভারত, রামায়ণের কাহিনী থেকে শুরু করে ১৯০০ শতকে মঙ্গলকাব্যের কাহিনীও যাত্রার রঙ্গমঞ্চে বাদ পড়েনি। ধিরে ধিরে কাহিনীর মোড় ঘুরেছে সামাজিক কাহিনী, স্বাধীনতার লড়াই থেকে বিংশ শতকের ইরাক যুদ্ধ অবধি। মঞ্চের কলাকুশলিদেরও থাকত নানান অবস্থান। মঞ্চের এক ধারে থাকত 'বিবেক' চরিত্র। কাহিনীর মূল কথক হত সে। কার কোন কথা মনে আছে তবে মুখে নেই সেটাই বলার কাজ ছিল বিবেকের। চরিত্রদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সব আবেগের কথা সে জানাতো দর্শকদের যাত্রায় নারী চরিত্রগুলিও থাকত পুরুষদের জিম্মায় তাই শাড়ি পরে,মেয়েদের মতন সেজে মঞ্চে যেতে হয়েছে বহু পুরুষকে। বহু অভিনেতার নামই ছিল অসাধারণ নারী চরিত্র মঞ্চস্থ করার জন্য। ১৯৫০ এর দশক থেকে নারীদের দেখা যেতে শুরু করে যাত্রায়। যাত্রার লোক সঙ্গীতে বাজত ঢোল,কর্তাল,খঞ্জনী। প্রচারের পোস্টার হত হাতে আঁকা ।
তবে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে গেছে যাত্রা। টিভি,মোবাইলের যুগে আর তেমন করে প্রয়োজন হয় না তার। যাত্রা শিল্পীদেরও তাই শীল্প ছেড়ে রোজগার করে খেতে হয়। তবে হারিয়ে গেলেও আজও ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে যাত্রার স্মৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন